দইয়ের দাম ও পরিমাণ নিয়ে বাড়ছে অসন্তোষ
জৌলুস হারাচ্ছে বগুড়ার দই
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৬-১০-২০২৬ ০২:০৫:০৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৬-১০-২০২৬ ০২:০৫:০৪ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
বগুড়ার দই বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাটির সরায় সাজানো সুস্বাদু ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, অন্তত দেড়শো বছরের ঐতিহ্য পেরিয়ে বগুড়ার দই এখন দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে পরিচিতি পেয়েছে। ২০২৩ সালে পেয়েছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতিও। অথচ এই স্বীকৃতির পরও দইয়ের দাম ও পরিমাণ নিয়ে ক্রেতাদের অসন্তোষ বাড়ছে। অভিযোগ উঠেছে, দিন দিন ছোট হচ্ছে দইয়ের সরা, বাড়ছে তলার মাটির পুরুত্ব; ফলে দাম বাড়লেও কমছে প্রকৃত দইয়ের পরিমাণ। এতে বগুড়ার বিখ্যাত দইয়ের ঐতিহ্য ও জৌলুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, বগুড়ার দইয়ের আদি ইতিহাস মূলত শেরপুর উপজেলাকে ঘিরে। বগুড়া মহানগরে দই জনপ্রিয় হওয়ার অন্তত ৫০ বছর আগে শেরপুরের ঘোষ সম্প্রদায় দই তৈরিতে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। বর্তমানে শেরপুর পৌরসভার শিশু পার্ক এলাকায় প্রতিদিন বসে দুধের বাজার। এক ঘণ্টার এই বাজারে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার লিটার দুধ কেনাবেচা হয়। মানভেদে প্রতি লিটার দুধের দাম ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২১ লাখ টাকার দুধের লেনদেনকে কেন্দ্র করেই টিকে আছে শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী দই শিল্প।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড়শো বছর আগে বগুড়ার শেরপুরে সনাতন ঘোষ সম্প্রদায়ের কারিগরেরা দই তৈরির বনিয়াদ করেছিলেন। এখানে ঘোষপাড়া নামের একটি মহল্লায় গড়ে উঠেছে দই তৈরির বিশাল কর্মযজ্ঞ। শেরপুরের দইয়ের প্রবল অনুরাগী ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নবাব মোহাম্মদ আলী। তিনি শেরপুরের ঘোষপাড়ার গৌর গোপালকে বগুড়ায় নিয়ে যান। নবাববাড়ি রোডে গৌর গোপাল তার দইয়ের ব্যবসা শুরু করেন।
১৯৩৮ সালের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ গভর্নর স্যার জন এন্ডারসন বগুড়ায় নবাববাড়িতে অতিথি হয়ে এলে কাচের পাত্রে পাতা দই দিয়ে নবাব তাকে আপ্যায়িত করেন। গভর্নর বগুড়ার দইয়ের স্বাদে পরিতৃপ্ত হয়ে ইংল্যান্ডে দই নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এভাবেই কালক্রমে বগুড়ার দই দেশের বাইরেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
শেরপুরের দইয়ের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা চতুর্থ প্রজন্মের কারিগর কাজল ঘোষ বলেন, ‘বগুড়া মহানগর দই চেনার অনেক আগে থেকেই আমার পূর্বপুরুষরা মহিষের খাঁটি দুধ দিয়ে হাঁড়িতে দই পাততেন। দাদুর বাবার হাত ধরে এই ব্যবসার সূচনা। শুরুতে হাঁড়িতে দই পাতা হলেও পরবর্তী সময়ে সরার ব্যবহার একে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয়।’ তবে এই ঐতিহ্য নিয়ে আক্ষেপও রয়েছে তার। কাজল ঘোষ বলেন, ‘বর্তমানে সাভার, দিনাজপুর ও রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে শেরপুরের সরা ও কারিগর নিয়ে গিয়ে নিম্নমানের দই তৈরি করে বগুড়ার দই নামে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে আদি এই শিল্পের দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনাম নষ্ট করছে। ১০ বছর আগের সেই জৌলুস এখন নকল ও ভেজালের ভিড়ে ম্লান হতে বসেছে।’
শেরপুর পৌরসভার শিশুপার্ক এলাকার দুধ বাজারের ইজারাদার হাফিজ জানান, ‘এখান থেকেই প্রতিদিন শম্পা দই ঘর, বৈকালী দই ঘর, জলযোগ, সাউদিয়া, রিংকিসহ স্থানীয় বড় বড় দই কারখানাগুলো দুধ সংগ্রহ করে। আশপাশের কোনও উপজেলায় এমন দুধের বাজার নেই।’ তবে সামনে দুধের দাম আরও বাড়তে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
সরার আকার ছোট, ক্ষোভ ক্রেতাদের:
শেরপুরের দইয়ের স্বাদ সর্বত্র সমাদৃত হলেও বর্তমানে দইয়ের পরিমাণ ও দাম নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দিন দিন দইয়ের সরার আকার ছোট হচ্ছে। পাশাপাশি সরার তলদেশ অস্বাভাবিক মোটা করে দইয়ের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
দই কিনে বাড়ি ফেরার পথে চাকরিজীবী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, তিনি শেরপুরের ধুনট মোড়ের সরকার দইঘর থেকে ১৫০ টাকায় দই কিনেছেন। কিন্তু সরার গায়ে ওজনের কোনও উল্লেখ নেই। বিএসটিআইয়ের সিল থাকলেও পরিমাণ স্পষ্ট নয়।
নিয়মিত ক্রেতা শিক্ষক মোজাফ্ফর আলী বলেন, ‘ভোক্তারা এখন দ্বিমুখী লোকসান গুনছেন। একদিকে দাম বাড়ছে, অন্যদিকে সরার আয়তন সংকুচিত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে দুধের দাম কমলেও দইয়ের দাম কমে না।’
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য কী
শেরপুরের প্রসিদ্ধ শম্পা দধি ভান্ডারের তপন ঘোষ জানান, তাঁরা প্রতিদিন প্রায় ২৫ মণ দুধ কেনেন। তিনি বলেন, ‘বিএসটিআই থেকে সরাপ্রতি ৫০০ গ্রাম দই রাখার অনুমতি থাকলেও তারা মান ঠিক রাখতে প্রতি সরা ২২০ টাকায় বিক্রি করছেন।’
বৈকালী দই ঘরের পার্থ সাহা জানান, তাঁরা প্রতিদিন ১৭ মণ দুধ কেনেন এবং ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় প্রতি সরা দই বিক্রি করেন। তাঁর ভাষ্য, ‘আগে ৭৫০ গ্রাম পর্যন্ত দই থাকলেও এখন মাপ কিছুটা কমেছে।’
শম্পা দধি ভান্ডারের রকিবুল হোসেন জানান, মানভেদে তারা ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় স্পেশাল দই বিক্রি করছেন।
দই তৈরির পর সরবরাহ করেন উপজেলার কল্যাণী, কাশিয়াবালা ও শিমলা গ্রামের পাল সম্প্রদায়ের কারিগরেরা। কল্যাণী পালপাড়ার মো. মতি বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী ৫০০ গ্রাম, ৬৫০ গ্রাম বা এক কেজি মাপের সরা তৈরি করে দিই। প্রতিটি সরা আমরা ১২ টাকায় বিক্রি করি।’
বছরে ৪০০ কোটি টাকার দইয়ের বাজার
শেরপুরের পাশাপাশি বগুড়া মহানগরীতেও দীর্ঘদিন ধরে এশিয়া সুইটমিট, আকবরিয়া, শ্যামলী, মহরম দইঘর, দইঘর, চিনিপাতা দই, ফুডভিলেজ মিঠাইসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দইয়ের ব্যবসা রয়েছে। দইয়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শেরপুরের তুলনায় মহানগরীতে দইয়ের দাম বেশি।
সাধারণ, স্পেশাল, মালাইসহ বিভিন্ন মানের দই বিক্রি হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে বগুড়ায় প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকার দই কেনাবেচা হয়। মাসে যার পরিমাণ প্রায় ৯ থেকে ১৫ কোটি টাকা। বছরে গড়ে এই বাজার ৪০০ কোটি টাকারও বেশি। ঈদের মৌসুমে বিক্রি আরও বেড়ে যায়।
আকার ও মানভেদে প্রতি হাঁড়ি বা সরা দই ৩৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৩৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে দইয়ের দামের তুলনায় পরিমাণ কম দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও এ বিষয়ে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যকর নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে ক্রেতাদের।
অভিযান ও কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস
বগুড়ার নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো. রাসেল বলেন, ‘দই তৈরির পরিবেশ ও হাইজিন নিয়ে তাদের কঠোর পর্যবেক্ষণ রয়েছে। কোনও ক্ষতিকর রাসায়নিক বা রঙের ব্যবহার রোধে তারা নিয়মিত কাজ করছেন।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর বগুড়ার সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মেহেদী হাসান বলেন, ‘দইয়ের সরার নিচে অতিরিক্ত মাটির প্রলেপ দিয়ে ওজনে কম দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ব্যাপারে তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন। অনিয়মের প্রমাণ পেলে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
শেরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নিয়ায কাযমীর রহমান জানান, উপজেলায় ১৪৫ থেকে ১৫০টি দইয়ের কারখানা রয়েছে। খামারিদের মানসম্মত দুধ উৎপাদনে আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
বগুড়া বিএসটিআই আঞ্চলিক অফিসের সহকারী পরিচালক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘দইয়ের সরার গায়ে ওজন এবং মেয়াদের স্পষ্ট উল্লেখ থাকা বাধ্যতামূলক। আমরা সব দই কোম্পানিকে একই ওজন ও মানে নিয়ে আসতে কাজ করছি।’
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, ‘শেরপুরের দই আমাদের একটি ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ড এবং এই অঞ্চলের গৌরবের প্রতীক। বগুড়ার বিখ্যাত দই ২০২৩ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে। শিল্প মন্ত্রণালয়াধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদফতর (ডিপিডিটি) ওই বছরের জুন মাসে এই অনুমোদন প্রদান করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই দই শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার মানুষের জীবিকা রক্ষা ও ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা নিয়মিত বাজার তদারকি করছি। দইয়ের ওজনে কারচুপি বা অন্য কোনও অনিয়ম করে যারা প্রাচীন এ শিল্পের সুনাম নষ্ট করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দইয়ের মান ও ঐতিহ্য বজায় রাখতে আমাদের এই নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও বিশেষ অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স